ঘুষ আর দুর্নীতি তে ঘেরা গাজীপুর সদর সাব রেজিস্ট্রার অফিস
গাজীপুর সদর সাব রেজিস্ট্রার মাসুম বিরুদ্ধে ঘুষ বানিজ্য অভিযোগ উঠেছে

প্রকাশ্যে ঘুষ লেনদেনের চিত্র গাজিপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সর্বত্র। এ যেন ঘুষের স্বর্গরাজ্য। কোনো রাখঢাক নেই। ঘাটে ঘাটে বাঁধা ঘুষের রেট। মুখে মুখে ঘুরছে ফর্দ। ঘুষের কারবার চলছে অনেকটা সাধারণ ব্যাংকিংয়ের মতো। দিনশেষে ঘুষের টাকা বণ্টনে চালু আছে অটোপদ্ধতি। অর্থাৎ নির্বিঘ্নে নির্ধারিত কমিশন পৌঁছে যায় সংশ্লিষ্টদের টেবিলে। আর এসব ঘুষ লেনদেনের প্রধান হলেন অফিস সহকারী (কেরানি) নিরঞ্জন চন্দ্র ধর।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এই অফিসে মোটা অঙ্কের ঘুষ ছাড়া কোনো জমির রেজিস্ট্রি হয় না। দলিল লেখক সমিতির কয়েকজন নেতা, দালাল সিন্ডিকেট ও সাব-রেজিস্ট্রারের কথিত সহকারীর আমিনুল ইসলাম মাধ্যমে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা ঘুষ আদায় করা হয়। এসব টাকা থেকে একটি অংশ স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ‘ম্যানেজ’ করতে খরচ হলেও অধিকাংশই নিজের কাছে তুলে নেন অফিস সহকারী নিরঞ্জন চন্দ্র ধর।
অভিযোগ রয়েছে, অফিসে আসা সাধারণ মানুষদের নানা অজুহাতে হয়রানি করা হয়। “কাগজে সমস্যা আছে” বলে ভয় দেখিয়ে নেয়া হয় মোটা অংকের উৎকোচ। জমির সব কাগজ ঠিকঠাক থাকলেও ‘ফ্রেশ জমি’কে ‘ডোবা’, ‘নালা’ বা ‘পতিত’ হিসেবে দেখিয়ে নেয়া হয় বাড়তি ঘুষ। সরকারি নির্ধারিত ফি’র বাইরে দলিলপ্রতি সহকারী নিরঞ্জন চন্দ্র ধরের মাধ্যমে আদায় করা হয় অতিরিক্ত অর্থ। এসব টাকা ‘নাস্তা খরচ’, ‘ম্যানেজ ফি’ বা ‘সহযোগিতা’র নামে নিয়মিতভাবে তোলা হয়।
ভুক্তভোগীরা জানান, এই ঘুষ বাণিজ্য শুধু সাব-রেজিস্ট্রারের একক প্রচেষ্টায় চলছে না। এতে জড়িত রয়েছে অফিসের ক্লার্ক, মোহরার, টিসি মোহরার ও অন্যান্য কর্মচারীরাও। কেউ ঘুষ দিতে রাজি না হলে তার কাজ আটকে দেয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, অফিস সহকারী নিরঞ্জন চন্দ্র ধর নিয়মিত দম্ভভরে বলেন, তার বিরুদ্ধে কেউ কিছু করতে পারবে না, কারণ তিনি “সব জায়গাতেই সিস্টেম করে” রেখেছেন।
বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, তিনি প্রতিমাসে গড়ে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষের টাকা আদায় করেন। কোনো কোনো দিন এই অঙ্ক ৮ থেকে ১০ লাখ টাকাও ছাড়িয়ে যায়। এসব অবৈধ উপার্জনের একটি অংশ নিয়মিতভাবে ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের দেওয়া হয় যাতে কেউ প্রশ্ন না তোলে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, নিরঞ্জন চন্দ্র ধর একই অফিসে চাকরি করছেন ২০১৯ সাল থেকে, গাজিপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে
পোস্টিং নিয়ে থাকতে জেলা রেজিস্ট্রার কে মোট অঙ্কের ঘুষ নিয়মিত দেন বলে নারায়ণ দাস প্রকাশ্যে বলে বেড়ান।
সেবা নিতে আসা ভুক্তভোগী ও দলিল লেখকরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রতিটি দলিলের ক্ষেত্রে প্রত্যেক গ্রাহককে উৎস কর ২ শতাংশ, স্ট্যাম্প দেড় শতাংশ, রেজিস্ট্রি বাবদ ১ শতাংশ ও স্থানীয় কর হিসাবে ৩ শতাংশ ব্যাংক চালানের মাধ্যমে জমা দিতে হয়। এর বাইরে প্রতিটি দলিলে নগদ এক হাজার থেকে তিন হাজার টাকা, সামান্য ভুলের জন্য আরও বিভিন্ন অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়ে থাকে।
সমিতির ফি নামে প্রত্যেক দলিলে ৫০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়। প্রতিদিন ৫০-৬০টি দলিল এই অফিসে রেজিস্ট্রি হয়ে থাকে। আর অফিস সহকারী নিরঞ্জন চন্দ্র ধর এই চাঁদা আদায় করে ভাগ পান ১০ হাজার টাকা। কমিশন দলিলে সাব-রেজিস্ট্রারকে ভাঙিয়ে সরকারি ফির অতিরিক্ত ২০ হাজার টাকা নিয়ে থাকেন তিনি। হেবা ঘোষণা দলিলে প্রতি লাখে ৪০০ টাকা ও সেরেস্তা ফি প্রতি লাখে ৩-৪ টাকা করে নিয়ে থাকেন নিরঞ্জন চন্দ্র ধর। আর এ টাকা অফিসের অন্যদের ও দলিল লেখকদের মধ্যে ভাগ হয়। অতিরিক্ত অর্থের ঘুষের টাকা থেকে অফিস সহকারী ৩০ ভাগ পেয়ে থাকেন বলে জানা গেছে।
এসব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নিরঞ্জন চন্দ্র ধর বলেন, ‘আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে এখানে বদলি হয়ে এসেছি। এদিক-সেদিক না করলে চলবে কীভাবে।’
এলাকাবাসীর দাবি, প্রতিদিন অফিস শেষে অফিস সহকারী নিরঞ্জন চন্দ্র ধর ঘুষের টাকা নিয়ে বাসায় ফেরেন। এই সময় দুর্নীতি দমন কমিশন গোপনে অভিযান চালালে তাকে হাতেনাতে ধরা সম্ভব। সচেতন মহল মনে করছে, তার অনৈতিক কার্যকলাপ রেজিস্ট্রেশন বিভাগের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে, একইসাথে অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। গাজীপুর সদর সাব রেজিস্ট্রার মোঃ মাসুম নেতৃত্বে অফিস সহকারী নিরঞ্জন চন্দ্র ধর ও মোহরার গাজী উম্মে আসমা বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এ সাব রেজিষ্ট্রি অফিসে যোগদানের পর থেকে সাব রেজিস্ট্রার মাসুম তিনি এ অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়েছেন বলে জানিয়েছেন দলিল লিখকরা।



আপনার মতামত লিখুন