ভূমিকম্পন: পঙ্গু হাসপাতালের ব্যতিক্রমী শুক্রবার
ছাদে কাপড় শুকাতে উঠেছিলেন বিউটি বেগম। শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকালের স্বাভাবিক কাজ রশিতে কাপড় ঝুলিয়ে দেওয়া, একটু রোদে দাঁড়ানো। কিন্তু মুহূর্তেই বদলে যায় তার দিনের রং। ভবনটা দুলতে শুরু করে, যেন নৌকা দোল খাচ্ছে নদীর ঢেউয়ে। কাপড়ের রশিতে ঝোলানো শাড়িগুলো এক দিক থেকে অন্য দিকে দুলে ওঠে। নিচের রাস্তা, পাশের ভবন- সব যেন কেমন দুলছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাথা ঘুরে যায় তার, আর চোখের সামনে ভেসে ওঠে শূন্যতা। একটু পরেই- ধুপ করে শব্দ, তিনতলা ছাদ থেকে নিচে পড়ে যান বিউটি।
জ্ঞান ফিরতেই চারদিকে মানুষ, কোলাহল, ব্যথা আর চিৎকার। ক’টা হাড় ভাঙল, কতটা ক্ষতি হলো- এসব জানার আগেই অ্যাম্বুলেন্স তাকে ছুটে নিয়ে আসে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে। বিউটি বেগম একা নন; এ দিন সকাল থেকে পঙ্গু হাসপাতালের করিডর ভর্তি ভূমিকম্পে আহত মানুষে।
পঙ্গু হাসপাতালের দরজায় ঢুকলেই ব্যথার এক আলাদা গন্ধ লাগে। একদিকে কান্না, অন্যদিকে ব্যথায় কাতর মানুষ। কোথাও প্লাস্টারের গন্ধ, কোথাও অক্সিজেন সিলিন্ডারের শব্দ। প্রত্যেকেরই গল্প আলাদা, কিন্তু উৎস এক- সকালের সেই কয়েক সেকেন্ড।
কামাড়পাড়ার রিকশাচালক আব্দুল মোতালেব প্রতিদিনের মতো রিকশা চালাতে বের হয়েছিলেন। ভূমিকম্পের সময় রিকশা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে যান তিনি। পাঁচ মিনিট রাস্তায় পড়ে থাকা মানুষটির পাশে কেউ ছিল না। পরে স্থানীয়রা তাকে হাসপাতালে নেয়। এখন তার ডান পা প্লাস্টারবন্দি, সামনে অপারেশন। ছেলেটি পাশে দাঁড়িয়ে বলল, রিকশা চালাবো কবে, এই ভাবনায় দিশেহারা।
মহাখালীর রাশি সেন সাততলা ভবনের সিঁড়িতে তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে পড়ে যান। বারবার ব্যথায় কুঁকড়ে উঠছেন তিনি। তার স্বামী মনজ মধু বলেন, ‘শুধু একটা ভয়- কিছু হলে আমি তাকে কীভাবে সামলাব?’
আরেকদিকে কাওলার মিথিলা হাসান সিঁড়িতে পা বেঁকে পড়ে পা ভেঙেছেন। যে হাত দিয়ে মোবাইল ধরার কথা, সেই হাত দিয়ে এখন ব্যথার জায়গায় চাপ দিচ্ছেন তিনি। তার স্বামী বলেন, ‘ঝাঁকুনিটা এত তীব্র ছিল, মনে হচ্ছিল দেয়ালটাই ভেঙে পড়বে।’
পঙ্গু হাসপাতালের জরুরি বিভাগে বৃহস্পতিবারের চেয়ে শুক্রবার আলাদা। লোকজনের চাপ কেবল বাড়ছে। ট্রলিতে করে আনা হচ্ছে একের পর এক রোগী। চলমান জরুরি সেবার মাঝেও নার্সরা দৌড়াচ্ছেন এক বেড থেকে আরেক বেডে। বিকেল সাড়ে ৬টা পর্যন্ত এখানে চিকিৎসা নিয়েছেন মোট ৯০ জন। তাদের মধ্যে ১৮ জনকে ভর্তি করতে হয়েছে। ছোট-বড় অপারেশন হয়েছে ১০ জনের।
ডা. আবুল কেনান বললেন, ‘এমন অবস্থা আমরা সাধারণত বড় দুর্ঘটনার দিনেই দেখি। বেশির ভাগ রোগীর হাত-পা ভাঙা। অনেকে মেরুদণ্ডে আঘাত পেয়েছেন। পরিস্থিতি সামলাতে অতিরিক্ত নার্স, ডাক্তার, ওয়ার্ড বয় নিয়োগ করা হয়েছে।’
এই ভূমিকম্প কারও বাড়ি ভেঙে ফেলেনি, কারও ওপর দেয়াল চাপা পড়েনি। কিন্তু ভয় হ্যাঁ, ভয়ই মানুষকে আহত করেছে সবচেয়ে বেশি। কেউ দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পড়ে গেছেন, কেউ মাথা ঘুরে নিচে পড়ে গেছেন, কেউ দৌড়াতে গিয়ে আসবাবপত্রের ধাক্কা খেয়েছেন। পঙ্গু হাসপাতালের এক নার্স বললেন, ‘মানুষ ভূমিকম্পে কম, ভয়ে বেশি আহত হয়েছে। হঠাৎ সবাই দৌড় দেয়। কেউ কিছু দেখে না।’
পঙ্গু হাসপাতালের করিডরে দাঁড়িয়ে আছেন বিউটির মা, হানুফা বেগম। চোখে ভয়, হাতে মেয়ের মেডিকেল রিপোর্ট। এ সময় তিনি বলেন, ‘দোয়া করেন। দুইটা বাচ্চা আছে ওর।’
নতুন বাজার থেকে আসা তানজিমা ফেরদৌসের কথাই ধরা যাক। মাথা ঘোরার কারণে পড়ে কোমরে আঘাত পেয়েছেন তিনি। নিজের যন্ত্রণার মাঝেও বললেন, ‘মনের মধ্যে এখনও সেই টান, মনে হয় আবার কাঁপবে।’



আপনার মতামত লিখুন